Header Ads

শীত না আসতেই তীব্র গ্যাসসঙ্কট



-
রাজধানীর কাঁঠালবাগানের আল আমিন রোডে বাস করেন নাসরিন সুলতানা। তিনি জানান, ফজরের পর চুলায় গ্যাস থাকে না। গ্যাসবিহীন চলে বিকেল ৩টা/সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। সাড়ে ৩টার পর যা-ও বা গ্যাস আসে সন্ধ্যার আগেই আবার চলে যায়। গ্যাস আসে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার পর। ফলে রাত জেগে দিনের রান্না করতে হয়। কিন্তু সকালে গ্যাস না থাকায় রাতের খাবার গরম করা যায় না। তিনি পড়েছেন মহাসঙ্কটে। একে তো রাত জেগে রান্না করতে হয়, এর ওপর সকালে গ্যাস না থাকায় বাসি খাবার খেতে খেতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বাধ্য হয়ে তিনি একটি কেরোসিনের চুলা কিনেছেন। এতে তার ব্যয় বেড়ে গেছে।
মিরপুর-২ থেকে আমিনুল ইসলাম জানান, গ্যাস নিয়ে যেন সাধারণ জনগণের সাথে তামাশা শুরু হয়েছে। প্রতিদিনই ভোর থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চুলায় গ্যাস থাকে না। হঠাৎ গ্যাস আসে। তখন চাপ বেশি থাকায় ভাত, তরিতরকারি পুড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়। আবার রাতে গ্যাসের চাপ কমে যায়। গত রমজানের পর থেকে এভাবেই চলছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এতো তামাশা না করে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিলেই তো হয়। এক দিকে মাস শেষে সরকার সাধারণের কাছ থেকে গ্যাস বিল নিচ্ছে, অপর দিকে ঠিক মতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারের গ্যাস বিলের পাশাপাশি সিলিন্ডারের জন্য বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।
কাঁঠালবাগান, মিরপুরের মতো রাজধানীজুড়েই গ্যাসের একই অবস্থা। প্রায় সব এলাকায় ভোর থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকে। পরে যা-ও বা আসে তাও কোনো কোনো এলাকায় টিম টিম হওয়ায় এক ঘণ্টার রান্নায় তিন ঘণ্টা লেগে যায়। গ্যাসসঙ্কটের কারণে অনেক এলাকায় গৃহিণীদের রাত জেগে রান্না করতে হচ্ছে।
শীত আসতে না আসতেই এ পরিস্থিতি। গ্যাসের এ সঙ্কট আরো ঘনীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গ্যাসসঙ্কটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। গভীর রাত জেগে রান্না করতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। যারা রাত জেগে রান্না করতে পারছেন না তাদের বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। আবার হোটেলগুলোতেও খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। বাসি খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। এতে অনেকেই পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের বাসি খাবার খেয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। গ্যাস সমস্যার কারণে কেউ কেউ কেরোসিনের চুলা কিনছেন। এ চিত্র রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায় বিরাজ করছে। শুধু বাসাবাড়িতেই সমস্যা হচ্ছে না, সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এতে একবার গ্যাস নিতে ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে সিএনজিচালিত গাড়িগুলোকে। এ কারণে সিএনজি পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন পড়ে যাচ্ছে।
রাজধানীবাসীর এ দুর্ভোগ যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রতি বছরই শীতের শুরুতে এ সঙ্কট শুরু হয়, স্থায়ী হয় পুরো শীতজুড়ে। দুর্ভোগের কারণ নিয়ে বরাবরই গ্যাস খাতের সংস্থাগুলো পরস্পরকে দোষারোপ করতে দেখা যায়। যেমন, গ্যাস বিতরণের সাথে জড়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তিতাস থেকে বলা হয়, চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে গ্যাস সরবরাহ করছে না পেট্রোবাংলা। আবার পেট্রোবাংলা থেকে তিতাসের পাইপলাইনকে দোষারোপ করা হয়। বলা হয় গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইনগুলো অনেক পুরনো এবং ব্যাসে কম থাকায় শীতকালে বর্ধিত চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যায় না।
জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে শীতে গ্যাসের সরবরাহ বেড়ে যায়। তাপমাত্রাভেদে অন্য সময়ের চেয়ে চাহিদা বাড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে অন্য সময়ের চেয়ে শীতে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য বেশি থাকে। বাসাবাড়িতে গরম পানি এবং শিল্পকারখানার বয়লারে এ সময় তুলনামূলক বেশি গ্যাস ব্যবহার হয়।
কিন্তু এবার শীত না আসতেই গ্যাসের এ ভয়াবহ সঙ্কটের বিষয়ে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, চাহিদা অনুযায়ী পেট্রোবাংলা গ্যাস দিতে পারছে না। এ কারণে তিতাস চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। তারা শুনেছেন তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ লাইনে ত্রুটি দেখা দেয়ায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে গত শনিবার থেকে পেট্রোবাংলা থেকে কাক্সিত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সঙ্কট তীব্র হচ্ছে এই কারণে।
তবে পেট্রোবাংলার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে। আমদানিকৃত এলএনজির প্রায় পুরোটাই চট্টগ্রামে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু গত শনিবার থেকে এলএনজি সরবরাহ পাইপলাইনে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এতে আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ আছে। ফলে বৃহত্তর চট্টগ্রামে গ্যাসসঙ্কট দেখা দেয়। শিল্পকারখানায় উৎপাদন চালু রাখতে ঢাকা থেকে গ্যাস পাঠানো হচ্ছে চট্টগ্রামে। আগে যেখানে চট্টগ্রামে গড়ে প্রতিদিন ৩৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, এখন সরবরাহ করা হচ্ছে ২০ কোটি ঘনফুট। এরপর থেকেই রাজধানীতে গ্যাসসঙ্কট বেড়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ৮ নভেম্বর ২৭৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ২০৫ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাসচাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৯১ কোটি ২১ লাখ ঘনফুট। সার কারখানাগুলোতে ৩১ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১৬ কোটি ৭৫ লাখ ঘনফুট। বাকি গ্যাস শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হয়েছে
পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহের বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ভরা শীতে গ্যাস রেশনিংয়ের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। ওই কর্মকর্তা জানান, প্রকৃতপক্ষে গ্যাসের উৎপাদনচাহিদা অনুযায়ী না বাড়লেও অবৈধ সংযোগ বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। একজন গ্রাহক বলেন, দুই ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন দিয়ে বৈধভাবে আগে গ্যাসসংযোগ নিয়েছিলেন ১০০ গ্রাহক। এখন ওই পাইপের সাথে অবৈধভাবে আরো প্রায় ৫০০ গ্রাহক গ্যাসসংযোগ নিয়েছেন। ফলে একই ব্যাসের পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে চাপ কমে যাচ্ছে। একে তো চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে না, অপর দিকে অবৈধ লাইন বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহকের দুর্ভোগ চরমে চলে গেছে। গ্যাসসঙ্কট কবে কাটবে তার কোনো সদুত্তর নেই কর্তৃপক্ষের কাছে।

No comments

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Powered by Blogger.